culture
পুরান ঢাকার রক্ষক: এক সহস্রাব্দের ইতিহাস বাঁচানোর লড়াই
বহুতল ভবনের অপ্রতিরোধ্য আগ্রাসনের মাঝে একটি ক্ষুদ্র সংরক্ষণকারী দল পুরান ঢাকার প্রায় তিন হাজার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা রক্ষায় লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, মুঘল দুর্গ থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক আমলের অট্টালিকা পর্যন্ত।
আমরা এটি কীভাবে রিপোর্ট করেছি

ঢাকা কোনো নবীন শহর নয়। ১৬১০ সালে মুঘল সুবেদার ইসলাম খান চিশতি যখন এটিকে বাংলার রাজধানী করে 'জাহাঙ্গীরনগর' নামকরণ করেন, তখন এই বসতির বয়স ছিল হাজার বছর। সেই গভীর ইতিহাসের ঘনীভূত রূপ আজও টিকে আছে পুরান ঢাকার এক একটি জীর্ণ গলিতে, যেখানে প্রায় তিন হাজার ঐতিহ্যবাহী ভবন এখনও দাঁড়িয়ে আছে, অধিকাংশই বেহাল দশায়। আর আজ সেই ভবনগুলো যে হুমকির মুখে পড়েছে, তা যেকোনো মুঘল অবরোধের চেয়ে কম ভয়ঙ্কর নয়: শহরের দিগন্তরেখা বদলে দেওয়া বহুতল নির্মাণের জোয়ার।
মুঘল ও ঔপনিবেশিক আমলের ছাপ
ঢাকায় এখনও টিকে থাকা সবচেয়ে পুরনো ইটের স্থাপনা হলো বিনত বিবি মসজিদ, যা ১৪৫৪ সালে সুলতানি আমলে নির্মিত, মুঘল যুগেরও এক শতাব্দীরও বেশি আগে। পরবর্তীকালে মুঘল শাসকেরা নিজেদের স্মৃতিচিহ্ন রেখে যান: সপ্তদশ শতাব্দীতে শাহজাদা আযম শাহের উদ্যোগে নির্মিত লালবাগ কেল্লা এবং আহসান মঞ্জিল, গোলাপি রঙের সেই প্রাসাদ যা ঢাকার নবাবদের সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই স্থাপনাগুলো দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে, তবে এগুলো পুরান ঢাকার মোট ঐতিহ্যের তুলনায় সামান্য মাত্র। বাকিগুলো, মুঘল দুর্গ, ঔপনিবেশিক অট্টালিকা, বণিকদের বাড়ি, নথিভুক্ত হলেও অধিকাংশই অযত্নে পড়ে আছে।
যারা রক্ষার লড়াই করছেন
ভাঙনের বিরুদ্ধে মূল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে 'আরবান স্টাডি গ্রুপ', একটি স্থাপত্য সংরক্ষণ সংগঠন, যারা পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো বাঁচাতে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি সহজ: একটি ভবন একবার ভেঙে নতুন টাওয়ার তোলা হলে, সেটি যে ইতিহাস বহন করত তা চিরতরে হারিয়ে যায়। সরকারি সহায়তা ছাড়াই মূলত জনসচেতনতা ও আইনি চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে সংগঠনটি ঐতিহ্য ধ্বংসের গতি কমানোর চেষ্টা করছে। তাদের মতে, ঢাকার নিজস্ব পরিচয়, একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত শহর হিসেবে তার অস্তিত্ব, নির্ভর করছে এই ভবনগুলোর টিকে থাকার ওপর, শুধু নথির পাতায় নয়, বাস্তবের ইট-পাথরেও।
রক্ষকদের চেয়ে দ্রুত বদলে যাচ্ছে শহর
সংখ্যাগুলোই অনেকটা গল্প বলে দেয়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, পুরান ঢাকায় প্রায় তিন হাজার ঐতিহ্যবাহী ভবন রয়েছে। এর অধিকাংশই জরাজীর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারিভাবে হালনাগাদ কোনো তালিকা প্রকাশিত হয়নি, এবং সংরক্ষণকর্মীরা বলছেন, ভাঙার ধারা অব্যাহত থাকায় প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই আরও কমে গেছে। আরবান স্টাডি গ্রুপের হিসাবে, প্রতি বছর কয়েক ডজন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হারিয়ে যাচ্ছে, অনেক সময় কোনো সরকারি ঘোষণা ছাড়াই, আর সেগুলোর জায়গায় উঠছে আবাসিক বা বাণিজ্যিক বহুতল ভবন, যা শহরের ক্রমবর্ধমান জায়গার চাহিদা মেটালেও মুছে ফেলছে স্থাপত্যের স্মৃতি।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
পুরান ঢাকার অধিকাংশ ভবনের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি ঐতিহ্য সংরক্ষণ পরিকল্পনা নেই। শহরের সংরক্ষণ আইনের আওতায় লালবাগ কেল্লা ও আহসান মঞ্জিলের মতো হাতে গোনা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পড়লেও, নথিভুক্ত তিন হাজার স্থাপনার বিশাল অংশই আইনি সুরক্ষার বাইরে। আরবান স্টাডি গ্রুপ একটি বিস্তৃত ঐতিহ্য তালিকা প্রণয়ন এবং ভাঙার বিধিমালা আরও কঠোরভাবে কার্যকর করার দাবিতে তদবির চালিয়ে যাচ্ছে। আপাতত, পুরান ঢাকার নির্মিত ইতিহাসের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সেই মুষ্টিমেয় স্থপতি, আন্দোলনকর্মী ও বাসিন্দাদের ওপর, যারা এই ঐতিহ্যকে নীরবে হারিয়ে যেতে দিতে রাজি নন।